অচল হয়ে মাঝপথ থেকেই ফিরছে মার্কিন রণতরী ‘জেরাল্ড আর ফোর্ড’
ইরানে সম্ভাব্য আগ্রাসন এবং মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র যে বিশাল সামরিক শক্তি প্রদর্শনের অংশ হিসেবে বিশ্বের বৃহত্তম যুদ্ধ বিমানবাহী রণতরী পাঠিয়েছিল, সেটি শেষ পর্যন্ত গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই নানা জটিলতায় পড়ে অচল হয়ে পড়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। সমুদ্রের এই শক্তিশালী যুদ্ধজাহাজটি, যা আধুনিক প্রযুক্তি ও সামরিক সক্ষমতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত, লোহিত সাগরে অবস্থান করেই বড় ধরনের কারিগরি ও অভ্যন্তরীণ সমস্যার মুখে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত মেরামতের জন্য ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফলে যে উদ্দেশ্যে এটি মোতায়েন করা হয়েছিল, তা বাস্তবায়নে সাময়িকভাবে বাধার সৃষ্টি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, যুদ্ধজাহাজটিতে অগ্নিকাণ্ডের একটি ঘটনা ঘটে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। আগুন লাগার পর সেটি নিয়ন্ত্রণে আনতে দীর্ঘ সময় লেগেছে এবং এতে জাহাজের ভেতরের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে লন্ড্রি বা ধোয়ার অংশে আগুন লাগার ফলে ধোঁয়ার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে জাহাজের বিভিন্ন জায়গায়, যার কারণে প্রায় ২০০ নাবিক শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন সমস্যায় আক্রান্ত হন এবং তাদের চিকিৎসা দিতে হয়েছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে ৩০ ঘণ্টারও বেশি সময় লেগেছে বলে জানা গেছে, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতা বোঝায়।
এছাড়া আগুনের ঘটনায় জাহাজের প্রায় ১০০টি থাকার জায়গা বা স্লিপিং বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, ফলে অনেক নাবিককে স্বাভাবিক পরিবেশে বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে হয়েছে। এমনকি পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয়ে ওঠে যে কিছু মার্কিন সেনাকে অস্থায়ীভাবে হোটেল সদৃশ ব্যবস্থার মেঝেতে ঘুমাতে হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি জাহাজের অভ্যন্তরীণ অবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েনের চাপের একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে।
এর পাশাপাশি যুদ্ধজাহাজটির টয়লেট সিস্টেমেও বড় ধরনের সমস্যা দেখা দেয়, যা নাবিকদের দৈনন্দিন জীবনে মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টয়লেট ব্যবস্থার অচলাবস্থার কারণে জাহাজে দীর্ঘ লাইন সৃষ্টি হয় এবং নাবিকদের জন্য মৌলিক সেবা গ্রহণ করাও কঠিন হয়ে পড়ে। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধজাহাজে এ ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিকভাবেই এর সামগ্রিক সক্ষমতা এবং প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
বর্তমানে এই রণতরীটি লোহিত সাগরে অবস্থান করছে এবং সাময়িকভাবে গ্রিসের ক্রেট দ্বীপের সৌদা বে বন্দরে গিয়ে নোঙর করার পরিকল্পনা করা হয়েছে, যেখানে প্রয়োজনীয় মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ সম্পন্ন করা হবে। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এটি একটি সাময়িক ব্যবস্থা এবং দ্রুত সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে, যাতে জাহাজটি পুনরায় কার্যক্রমে ফিরতে পারে।
উল্লেখ্য, এই যুদ্ধজাহাজটি প্রায় ৯ মাস ধরে বিভিন্ন অঞ্চলে মোতায়েন রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে আসার আগে এটি ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে অভিযানে অংশ নিয়েছিল। এত দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থাকার কারণে জাহাজটির যান্ত্রিক অংশে চাপ পড়া এবং নাবিকদের মানসিক ও শারীরিক ক্লান্তি তৈরি হওয়া স্বাভাবিক বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ফলে এর যুদ্ধপ্রস্তুতি এবং কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এত বড় এবং জটিল প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধজাহাজ পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন এবং এতে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ অত্যাবশ্যক। দীর্ঘ সময় ধরে টানা মোতায়েন থাকলে ছোটখাটো সমস্যা দ্রুত বড় আকার ধারণ করতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত পুরো জাহাজের কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে। এই ঘটনাটি সেই বাস্তবতারই একটি উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের এই বৃহত্তম যুদ্ধ বিমানবাহী রণতরীর হঠাৎ করে অচল হয়ে পড়া এবং মেরামতের জন্য ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্যের চলমান পরিস্থিতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। এটি একদিকে যেমন সামরিক কৌশল ও প্রস্তুতির সীমাবদ্ধতা তুলে ধরছে, অন্যদিকে প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধযানের ক্ষেত্রে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের গুরুত্বও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।
সূত্র: দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট ও দ্য গার্ডিয়ান।
