আসছে নতুন কমিটি, বিএনপির অঙ্গসংগঠনগুলোর শীর্ষ পদে তালিকায় আছেন যারা

 


বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর সাংগঠনিক কার্যক্রমে দীর্ঘদিন ধরে স্থবিরতা ও অনিয়মের অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। দলটির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি তিন বছর পরপর কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠনের বিধান থাকলেও বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ১১টি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের মধ্যে ১০টিরই মেয়াদ বহু আগেই শেষ হয়ে গেছে। কোথাও ৫ বছর, কোথাও ৮ বছর, আবার কোথাও ১০ বছরের বেশি সময় ধরে একই কমিটি দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। ফলে দলীয় কাঠামোর স্বাভাবিক নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হচ্ছে এবং তৃণমূল পর্যায়ে কর্মীদের মধ্যে হতাশা ও অসন্তোষ বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


দলীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে কমিটি পুনর্গঠন না হওয়ায় অনেক অঙ্গসংগঠন কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ কমিটি না দিয়ে আংশিক বা ‘সুপার ফাইভ’ দিয়ে সংগঠন পরিচালনা করা হচ্ছে, যা সাংগঠনিক কার্যক্রমকে সীমিত করে ফেলছে। পদপ্রত্যাশী নেতাকর্মীদের মধ্যে এ নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে এবং নেতৃত্বে আসার সুযোগ না পাওয়ায় অনেকেই রাজনীতিতে আগ্রহ হারাচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।


তবে সম্প্রতি বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানা গেছে। দলটির হাইকমান্ড ইতোমধ্যে কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতাকে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর সার্বিক অবস্থা পর্যালোচনার নির্দেশনা দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, পবিত্র ঈদুল ফিতরের পরপরই এসব সংগঠনের নতুন কমিটি ঘোষণা করা হতে পারে। এতে করে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে সংগঠনগুলোতে নতুন গতি ফিরে আসবে বলে আশা করছেন নেতাকর্মীরা।


গত ২৮ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর তেজগাঁও কার্যালয়ে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান Tarique Rahman তার রাজনৈতিক উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠকে এই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেন। তিনি দলের সাংগঠনিক শক্তি বাড়াতে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর পুনর্গঠন দ্রুত শুরু করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। সূত্র মতে, তিনি ঈদের পরপরই এ প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রস্তুতি নিতে বলেছেন।


বিএনপির অঙ্গসংগঠনগুলোর মধ্যে রয়েছে জাতীয়তাবাদী যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, মহিলা দল, কৃষক দল, তাঁতীদল, মৎস্যজীবী দল, মুক্তিযোদ্ধা দল, জাসাস ও ওলামা দল। অন্যদিকে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও শ্রমিক দলকে সহযোগী সংগঠন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে বিস্ময়ের বিষয় হলো, দীর্ঘদিন পার হলেও এসব সংগঠনের অনেকগুলোরই পূর্ণাঙ্গ গঠনতন্ত্র তৈরি হয়নি। বিশেষ করে ছাত্রদল প্রতিষ্ঠার প্রায় ৪৭ বছর পরও পূর্ণাঙ্গ গঠনতন্ত্র না হওয়ায় সংগঠন পরিচালনায় নানা জটিলতা তৈরি হচ্ছে।


বিএনপির প্রধান যুব অঙ্গসংগঠন জাতীয়তাবাদী যুবদল দীর্ঘদিন ধরে আংশিক কমিটি দিয়ে চলছে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের আগে আব্দুল মোনায়েম মুন্নাকে সভাপতি এবং নুরুল ইসলাম নয়নকে সাধারণ সম্পাদক করে আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হলেও এখনো পূর্ণাঙ্গ কমিটি দেওয়া সম্ভব হয়নি। এরই মধ্যে সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন ভোলা-৪ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ায় সাংগঠনিক কার্যক্রমে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।


স্বেচ্ছাসেবক দলের অবস্থাও প্রায় একই রকম। সংগঠনটির সভাপতি এসএম জিলানী এবং সাধারণ সম্পাদক রাজীব আহসান উভয়েই বর্তমানে সংসদ সদস্য। এর মধ্যে রাজীব আহসান সরকারের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে দলীয় সংগঠন পরিচালনায় তাদের সময় ও মনোযোগের ঘাটতি রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।


কৃষক দলের কমিটি গঠন করা হয় ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে, যেখানে হাসান জাফির তুহিন সভাপতি এবং শহিদুল ইসলাম বাবুল সাধারণ সম্পাদক হন। তিন বছর মেয়াদি এই কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে প্রায় দেড় বছর আগে। শহিদুল ইসলাম বর্তমানে সংসদ সদস্য হওয়ায় সংগঠনটির কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।


জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটি ২০২৪ সালের মার্চে ঘোষণা করা হলেও এর মেয়াদ ইতোমধ্যে শেষ হয়ে গেছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন ছাত্র সংসদ নির্বাচনে সংগঠনটির ভরাডুবি তাদের সাংগঠনিক দুর্বলতাকে আরও স্পষ্ট করেছে। ফলে ছাত্রদলকে দ্রুত পুনর্গঠনের দাবি উঠেছে দীর্ঘদিন ধরেই।


মহিলা দলের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও দীর্ঘস্থায়ী। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে আফরোজা আব্বাসকে সভাপতি এবং সুলতানা আহমেদকে সাধারণ সম্পাদক করে যে কমিটি গঠন করা হয়েছিল, সেটিই প্রায় ১০ বছর ধরে চলছে। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তিন বছর পরপর কাউন্সিল হওয়ার কথা থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি, যা দলীয় নীতিমালার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করছেন অনেকেই।


মুক্তিযোদ্ধা দলের সর্বশেষ কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয় ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে। ওই সময় ইশতিয়াক আজিজ উলফাত সভাপতি এবং সাদেক খান সাধারণ সম্পাদক হন। এরপর এক যুগের বেশি সময় পার হলেও নতুন কোনো কমিটি গঠন করা হয়নি। এতে করে সংগঠনটির ভেতরে নেতাকর্মীদের মধ্যে দূরত্ব ও হতাশা বাড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।


জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। ২০১৪ সালের এপ্রিলে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ কাউন্সিলে আনোয়ার হোসাইন ও নূরুল ইসলাম খান নাসিমের নেতৃত্বে কমিটি গঠিত হয়। ২০১৬ সালে মেয়াদ শেষ হলেও এরপর আর কোনো কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়নি। ফলে সংগঠনটি দীর্ঘদিন ধরে পুরোনো কাঠামোতেই চলছে।


মৎস্যজীবী দলের পরিস্থিতি আরও জটিল। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে রফিকুল ইসলাম মাহতাবকে আহ্বায়ক এবং আব্দুর রহিমকে সদস্য সচিব করে আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। ২০২৪ সালের আগস্টে মাহতাবের মৃত্যুর পর ২৩ সেপ্টেম্বর কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হলেও এরপর নতুন কোনো কমিটি গঠন করা হয়নি। ফলে সংগঠনটি কার্যত নেতৃত্বশূন্য অবস্থায় রয়েছে।


সব মিলিয়ে বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর এই দীর্ঘদিনের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি ও সাংগঠনিক স্থবিরতা দলটির সামগ্রিক রাজনৈতিক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তবে ঈদের পর সম্ভাব্য পুনর্গঠন কার্যক্রম যদি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে সংগঠনগুলোতে নতুন নেতৃত্ব আসবে এবং তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত একটি নতুন গতিশীলতা তৈরি হতে পারে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হচ্ছে।

Next Post Previous Post