ইনুকে ‘টেনশন না করতে’ বলা সেই দুই পুলিশ সদস্য প্রত্যাহার, বিভাগীয় ব্যবস্থার নির্দেশ

 


সাবেক মন্ত্রী ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনু-কে আদালতে নেওয়ার সময় শৃঙ্খলাবহির্ভূত মন্তব্য করার অভিযোগে দুই পুলিশ সদস্যকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

 একই সঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে, যা এই ঘটনাকে ঘিরে প্রশাসনিক কঠোরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বুধবার (২৯ এপ্রিল) ট্রাইব্যুনালের ডেপুটি রেজিস্টার মাহমুদুল হাসান-এর স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে জানানো হয়, ডিএমপি থেকে প্রেষণে ট্রাইব্যুনালে কর্মরত কনস্টেবল মো. জামাল হোসেন ও কনস্টেবল মো. সোলাইমান হোসেনের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ উঠেছে এবং বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ করা হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল সূত্রে জানা গেছে, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার আসামি ইনুকে এজলাস থেকে হাজতখানায় আনা-নেওয়ার সময় ওই দুই কনস্টেবল এমন মন্তব্য করেন, যা আদালতের শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ইনুকে আদালত কক্ষ থেকে নিয়ে যাওয়ার সময় দুই পুলিশ সদস্য তাকে উদ্দেশ করে বলেন, “টেনশন কইরেন না, আমরা আছি তো স্যার।” এই মন্তব্যটি সাধারণ দৃষ্টিতে সহানুভূতিশীল মনে হলেও বিচারাধীন একজন আসামির প্রতি এমন আচরণ আদালতের নিরপেক্ষতা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার পরিপন্থী হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল মনে করছে, এ ধরনের আচরণ বিচারিক পরিবেশে পক্ষপাতিত্ব বা অনুচিত প্রভাবের ধারণা সৃষ্টি করতে পারে, যা বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। ফলে ঘটনার পরপরই সংশ্লিষ্ট দুই পুলিশ সদস্যকে ট্রাইব্যুনালের নিরাপত্তা দায়িত্ব থেকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাহার করা হয় এবং তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।

এই ঘটনার মাধ্যমে আদালতের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কঠোর অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে। বিচারিক কার্যক্রমে নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের নিরপেক্ষতা, পেশাদারিত্ব এবং আচরণবিধি মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাদের যেকোনো বিচ্যুতি পুরো বিচারব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মতো সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনকালে প্রতিটি পদক্ষেপই অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নিতে হয়।

উল্লেখ্য, হাসানুল হক ইনু-এর বিরুদ্ধে জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যাসহ মোট আটটি অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা চলছে। এই মামলাটি দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে এবং এর বিচারপ্রক্রিয়া ঘিরে জনমনে ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। বুধবার তার পক্ষে ষষ্ঠ দিনের মতো যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন আইনজীবী মুনসুরুল হক চৌধুরী। শুনানি শেষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ মামলার পরবর্তী তারিখ হিসেবে আগামী ৪ মে নির্ধারণ করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনাটি শুধু একটি শৃঙ্খলাভঙ্গের বিষয় নয়, বরং এটি বিচারিক কাঠামোর প্রতি আস্থা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। আদালতের ভেতরে দায়িত্ব পালনরত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের প্রতিটি আচরণ জনসাধারণের দৃষ্টিতে বিচারব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি তৈরি করে। তাই এ ধরনের ঘটনায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া বিচারব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখার জন্য অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে এটি অন্যদের জন্যও একটি বার্তা যে, আদালতের শৃঙ্খলা ও নিরপেক্ষতার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।

সব মিলিয়ে, ইনুকে ঘিরে এই ঘটনাটি বিচারপ্রক্রিয়ার বাইরে হলেও এর প্রভাব বিচারব্যবস্থার ওপর পড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে ট্রাইব্যুনালের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়ক হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে এটি একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে কাজ করবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।

Next Post Previous Post